সরকার ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গুরুতর আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারানো জুলাই যোদ্ধাদের জন্য স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে ১ হাজার ৫৬০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা কমিশনে ১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব জমা দিয়েছে, যেখানে ১৫টি ভবন নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি ভবনে থাকবে ১৪টি তলা এবং পৃথক বেইসমেন্ট।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) চূড়ান্ত অনুমোদনের ভিত্তিতে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে রাজধানীর মিরপুর সেকশন-৯ এলাকায় ডিওএইচএস সংলগ্ন ৮৩৩ কাঠা জমিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি ফ্ল্যাটের গড় আয়তন হবে ১ হাজার ৩২০ বর্গফুট, যার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। জমির মূল্য ৩৭৪ কোটি টাকা যোগ হলে প্রতিটি ফ্ল্যাটের মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা। প্রতি বর্গফুট নির্মাণ ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৮ হাজার ৩৫০ টাকা, যা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ প্রস্তাবটি নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠক করেছে। সেখানে কিছু সুপারিশ সাপেক্ষে প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর মন্ত্রণালয় সংশোধিত প্রস্তাব পুনরায় জমা দিয়েছে।
তবে কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, অনুমোদনে বিলম্ব হতে পারে। কারণ এর আগে শহীদ পরিবারের জন্য ৭৬১ কোটি টাকার “৩৬ জুলাই ফ্ল্যাট নির্মাণ” প্রকল্প শেষ মুহূর্তে একনেক অনুমোদন পায়নি।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, খরচ, যৌক্তিকতা, বাস্তবায়ন কাঠামো ও অন্যান্য উপাদান পুনর্বিবেচনা করে একটি সমন্বিত প্রস্তাব আকারে আবারও একনেকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ছাত্র আন্দোলনে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণকারীদের ত্যাগকে সম্মান জানানো এবং তাদের পরিবারকে মানসম্মত স্থায়ী আবাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সহায়তা করা।
প্রতিটি ভবনে থাকবে বেইসমেন্টসহ ১৪ তলা। প্রতিটি তলায় আটটি করে ফ্ল্যাট থাকবে। আগে প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন ১ হাজার বর্গফুট ধরা হলেও পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩২০ বর্গফুট নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পে থাকবে গাড়ি পার্কিং (বেইসমেন্ট ও গ্রাউন্ড ফ্লোরে), লিফট, সাব-স্টেশন, জেনারেটর, সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও অগ্নিনির্বাপণ হাইড্রেন্ট। এছাড়া স্কুল, মসজিদ, খেলার মাঠ, সবুজ এলাকা ও অভ্যন্তরীণ সড়কসহ বিভিন্ন কমিউনিটি সুবিধাও যুক্ত হবে।
প্রকল্প এলাকা মিরপুর ডিওএইচএস থেকে ১ কিলোমিটার, মিরপুর-১১ মেট্রো স্টেশন থেকে ১.৫ কিলোমিটার এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কালশী ফ্লাইওভার ও ১২০ ফুট সড়ক সংযোগে এটি রাজধানীর অন্যান্য অংশের সঙ্গে সহজে যুক্ত। ফলে পরিকল্পিত আবাসিক প্রকল্পের জন্য এলাকা উপযোগী।
প্রায় ১ হাজার ৫৬০ পরিবার—অর্থাৎ ১০ হাজার মানুষ—সরাসরি এ প্রকল্প থেকে উপকৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিম্নআয়ের বহু মানুষও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন।
গত ২৭ জুলাই একনেক বৈঠকে জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারের জন্য গৃহায়ণ প্রকল্পটি পর্যালোচনা হলেও অনুমোদন মেলেনি।
বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, শহীদ পরিবারের জন্য ৮৩৪ জনের বিপরীতে প্রস্তাবে রাখা হয়েছে ৮০৪টি ফ্ল্যাট। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একই ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল কিনা, তা যাচাইয়েরও প্রয়োজন রয়েছে।
এ সময় পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সতর্ক করেন, উত্তরাধিকার ও হস্তান্তর বিষয়ক জটিলতা প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। গৃহায়ণ সচিবের প্রস্তাব ছিল, প্রয়োজনে জুলাই আন্দোলন অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে ধাপে ধাপে হস্তান্তরের সুযোগ রাখা যেতে পারে।
অর্থ উপদেষ্টা উপাদানভিত্তিক ব্যয়ের অসঙ্গতি তুলে ধরে খরচ যৌক্তিক ও স্বচ্ছ রাখার তাগিদ দেন।
কর্মকর্তা ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা প্রকল্পটি সংশোধন করে পুনরায় একনেকে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছেন।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস জোর দিয়ে বলেছেন, সমন্বিত নীতিমালা ছাড়া এ প্রকল্প এগোনো যাবে না। ফ্ল্যাট বরাদ্দ, উত্তরাধিকার ও বণ্টন প্রক্রিয়া পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে হবে অনুমোদনের আগে।