মঙ্গলবার, মার্চ ১০, ২০২৬

যমুনা সেতুর বিকল্প নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ

Jamuna new bridge
  • ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
  • প্রাথমিক বিবেচনায় তিন রুট

নিজস্ব প্রতিবেদক

যমুনা সেতুর ওপর বাড়তি চাপ সামলাতে নতুন একটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। নতুন এই সেতুটি যমুনা নদীতে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও গাইবান্ধার বালাসিঘাট পয়েন্ট, বগুড়া–জামালপুর পয়েন্ট বা পাটুরিয়া–গোয়ালন্দে পদ্মা নদীর ওপর নির্মাণ করা হতে পারে।

পদ্মা নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হলে এর সহায়ক হিসেবে পাবনা–রাজবাড়ীর মধ্যে আরও একটি সেতু নির্মাণ করতে হবে বলে সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) আজ অনুষ্ঠিতব্য বোর্ড সভায় নতুন প্রস্তাবিত সেতুর তিনটি স্পট নিয়ে আলোচনা হবে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও বিবিএ বোর্ড চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ ফওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে সভায় বোর্ডের সদস্যরা অংশ নিবেন।

সভার কার্ডপত্রে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালে উদ্বোধনের পর থেকে যমুনা সেতুতে গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৮ শতাংশ হারে যানবাহনের সংখ্যা  বাড়ছে এবং বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২২ হাজার যানবাহন এ সেতু দিয়ে চলাচল করছে।

ছুটির সময়ে এই সংখ্যা তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়, যার ফলে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। চলতি বছরের ঈদুল আজহার দিনে রেকর্ড ৬৪,৪৮৯টি যানবাহন এ সেতু ব্যবহার করেছে।

কর্মপত্রে বলা হয়েছে, চার লেনের এ সেতুটি ইতোমধ্যেই এর নকশাগত ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ সামলাতে আগামী এক দশকের মধ্যে নতুন একটি সেতু নির্মাণ প্রয়োজন হয়ে পড়বে।

“এই সেতুটি দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে ১৬টি জেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করেছে। বিকল্প সেতু নির্মাণ হলে সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করবে,” বলা হয়েছে কর্মপত্রে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে পরিচালিত একটি মাস্টারপ্ল্যান স্টাডিতে আগামী এক দশকের মধ্যে যমুনা সেতুর বিকল্প একটি রুট বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

স্টাডিতে প্রাথমিকভাবে ছয়টি স্থানে সেতু বা টানেল নির্মাণের সম্ভাবনা চিহ্নিত করা হলেও বর্তমানে তিনটি সেতু নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান বাছাই করা হয়েছে। টানেলের বিকল্পটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

কার্যপত্রে আরও বলা হয়েছে, নতুন সেতু নির্মাণ হলে বিদ্যমান যমুনা সেতুর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে, যানবাহনের চাপ বৈচিত্র্য আনবে এবং উত্তরাঞ্চলের সংযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও এগিয়ে নেবে।

সেতু বিভাগের প্রতিনিধিরা বোর্ড সভায় বিকল্প রুট নির্ধারণে সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) অনুমোদনের প্রস্তাব দেবেন।

যমুনা সেতুর কার্যকারিতা

নথিতে বলা হয়েছে, যমুনা সেতুর নির্মাণকাজ ১৯৯৪ সালে শুরু হয়ে ১৯৯৮ সালে শেষ হয় এবং ২৩ জুন ১৯৯৮ সালে এটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

৩৯৩৯ কোটি টাকায় নির্মিত এ সেতুটি এ পর্যন্ত (জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত) ৯৩৬৬ কোটি টাকা টোল আদায় করেছে—যা রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বাদে এর মূল নির্মাণ ব্যয়ের ২.৩৮ গুণ।

গত ১০ দিনে গড়ে প্রতিদিন পদ্মা সেতুতে ১৮,২৯৬.৮টি যানবাহন চলাচল করেছে, অথচ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকায় নির্মিত পদ্মা সেতুর তুলনায় যমুনা সেতুতে প্রতিদিনের যানবাহনের সংখ্যা ছিল ২১,৮৬০টি—যা ১৯.৪৭ শতাংশ বেশি। এ তথ্য বিবিএর টোল রিপোর্টে উঠে এসেছে।

যমুনা সেতু নির্মাণে সরকার নিজস্ব অর্থায়ন হিসেবে ১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা ব্যয় করে। আর এডিবি, আইডিএ ও ওইসিএফ থেকে ২ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়। এর মধ্যে মূলধন ও সুদসহ মোট ৪ হাজার ১৪১ কোটি টাকা পরিশোধ করা হলেও এখনো ১ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তাফা কে মুজেরি বিদ্যমান যমুনা সেতুর বিকল্প হিসেবে আরেকটি সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন এবং বলেন, টানেলের চেয়ে সেতু অর্থনৈতিকভাবে বেশি যৌক্তিক।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই আরেকটি মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হলে তা অর্থনীতির ওপর বড় চাপ ফেলবে। তাই নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার আগে বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং চলমান মেগা প্রকল্পগুলো শেষ করা জরুরি।