বিশেষ প্রতিবেদক
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতাভুক্ত প্রকল্প বাস্তবায়নে আবারও ভূমি অধিগ্রহণ ও বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন অপসারণে জটিলতা, প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) অদক্ষতা, ক্রয় প্রক্রিয়ায় জটিলতা এবং যথাযথ সমীক্ষার অভাবে প্রকল্পের দুর্বল প্রাক্কলনকে দায়ী করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।
দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি প্রকল্পের জন্য পৃথক পূর্ণকালীন পিডি নিয়োগ দেওয়া এবং বড় ধরনের অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়ার আগে ভূমি অধিগ্রহণ ও সেবা সংস্থার লাইন অপসারণে পৃথক প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংস্থাটি।
মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের আয়োজনে সরকারের সব উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সব মন্ত্রণালয়ের সচিবদের অংশগ্রহণে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের এক সেমিনারে আইএমইডি সচিব মো. কামাল উদ্দিনের উপস্থাপিত এক প্রকাশনায় এসব বিষয় উঠে আসে।
সভায় প্রকল্প প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়ন-পরবর্তী সময়ে এডিপির প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরেন কামাল উদ্দিন।
এ সময় তিনি বলেন, প্রতিটি ধাপে শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে অবকাঠামো প্রকল্পে সময়ক্ষেপণ, ব্যয় বৃদ্ধি এবং গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন অব্যাহত থাকবে।
আইএমইডি সূত্র জানিয়েছে, ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি উন্নয়ন প্রকল্পের একই ধরনের সমস্যা তুলে ধরছে। প্রতিটি সমস্যার প্রেক্ষিতে পৃথক সুপারিশ করা হলেও তা কখনোই আমলে নেয় না সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। এর ফলে প্রকল্পের সংখ্যা না কমে উল্টো বেড়েছে।
আইএমইডি সচিবের প্রকাশনায় বলা হয়, জমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের সমন্বয়হীনতা বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান বাধা।
তিনি প্রস্তাব দেন, বড় ধরনের অবকাঠামো উদ্যোগ নেওয়ার আগে আলাদা প্রকল্প গ্রহণ করে জমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ শেষ করা উচিত। এতে দীর্ঘসূত্রতা কমবে এবং মূল প্রকল্প দ্রুত এগোবে।
প্রবন্ধে জানানো হয়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে ২৫টি বড় সমস্যা রয়েছে—প্রকল্প প্রণয়নে ১০টি, বাস্তবায়ন পর্যায়ে ১০টি এবং বাস্তবায়ন-পরবর্তী ধাপে ৫টি।
প্রণয়ন পর্যায়ে দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, অসম্পূর্ণ নকশা, অংশীজনের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শের অভাব, ব্যয়ের ভুল অনুমান এবং অতিরিক্তভাবে পরামর্শকের ওপর নির্ভরতা প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বাস্তবায়ন পর্যায়ের সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক না থাকা, একই কর্মকর্তার ওপর একাধিক প্রকল্পের দায়িত্ব চাপানো, বারবার বদলি, এবং অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া। এছাড়া আইএমইডির পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া, প্রকল্প সময় বাড়ানোর প্রস্তাব দাখিলে দেরি, বাস্তবায়নকারী ও গ্রাহক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং বৈদেশিক অর্থায়িত প্রকল্পে উন্নয়ন সহযোগীদের অনুমোদন পেতে বিলম্বও কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা ৫০টি প্রকল্পের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) লক্ষ্যের ৪৮ শতাংশ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভার লক্ষ্যের ৪৯ শতাংশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এর ফলে প্রকল্পের অগ্রগতি ধীর হওয়ার পাশাপাশি সময় ও ব্যয়ের চাপ বেড়েছে বলে জানিয়েছে আইএমইডি।
বাস্তবায়ন-পরবর্তী ধাপে সমাপ্ত প্রকল্পের প্রতিবেদন (পিসিআর) দাখিলে দেরি, নির্মিত অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগে দেরি এবং প্রকল্প শেষে যানবাহন সরকারি পরিবহনপুলে হস্তান্তরে অনিয়মও বহাল রয়েছে।
এই সমস্যাগুলো মোকাবিলায় আইএমইডি বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিকল্পনা কমিশনের গাইডলাইন অনুযায়ী টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে নীতিমালা কঠোরভাবে মানা, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি ‘পিডি পুল’ গঠন করা এবং তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রকিউরমেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া। পাশাপাশি পিএসসি ও পিআইসি সভা নিয়মিত করা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন মনিটর করা, e-PMIS-এ তথ্য হালনাগাদ নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প সমাপ্তির আগেই টেকসই করার জন্য প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক কাঠামো ও জনবল নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আইএমইডি আরও জানায়, ক্রমবর্ধমান প্রকল্প সংখ্যা ও পরিধির সঙ্গে সমন্বয় রেখে তাদের জনবল বা কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। এমনকি প্রকল্পে ব্যবহৃত উপকরণের মান যাচাইয়ের জন্য নিজস্ব পরীক্ষাগার না থাকায় গুণগত মান নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএস-এর সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফা কে মুজেরি বলেন, “বাংলাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়নের এই সমস্যাগুলো যুগের পর যুগ ধরে চলছে। প্রতিটি সমস্যাই চিহ্নিত হয়েছে, সমাধানের প্রস্তাবও এসেছে। কিন্তু কোনো সংস্থা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয় না। আইএমইডির সুপারিশ কার্যকর করার ক্ষমতা নেই বলেই এ অবস্থার পরিবর্তন হয় না।”