বিভিন্ন খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়ছে এটুআই প্রকল্পে
আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এটুআই প্রোগ্রামে “কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক” খাতে ছয় বছরের জন্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ ছিল মাত্র ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রকল্পটির এক বছর মেয়াদ বাড়াতে এ খাতে ৮৫ কোটি ২৯ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দের আবদার জানিয়েছে আইসিটি বিভাগ। এই আবদার পূরণ হলে এই একটি খাতেই ব্যয় বাড়বে ৩৪ গুণ। প্রকল্পের শেষ বছরে এসে হিসাব-নিকাশ মেলানোর পাশাপাশি কাজের জন্য কেনা উপকরণ হস্তান্তরের তোড়জোড় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কম্পিউটার কেনায় ৮২ কোটি ৭৯ লাখ ৪৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের দাবি আসায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। এভাবেই বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দেশের সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্পগুলোর একটি এসপায়ার টু ইনোভেট বা এটুআই প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। প্রকল্প ব্যয়ের সার্বিক চিত্রে দেখা যায়, দ্বিতীয় সংশোধন অনুমোদন পেলে এটুআই প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়াবে ১ হাজার ৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হবে প্রায় ৭৫৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা আগের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। শুধু কম্পিউটার কেনার খাতই নয়, অন্যান্য খাতেও উল্লেখযোগ্য হারে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সফটওয়্যার কেনা ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ১৮৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যা আগের বরাদ্দের চেয়ে ৫৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা বা ৪২ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া ডাটা সংরক্ষণের জন্য ২৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা, পরামর্শক খাতে ৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, প্রশিক্ষণে ৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা, সেমিনারের জন্য ৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, ইন্টার্ন ভাতায় ৪ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে ৩ কোটি ১ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, এক বছরের জন্য ডাটা সংরক্ষণ ব্যয় দ্বিগুণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীর খাতে ৭০ শতাংশ, আসবাবপত্র খাতে ৫৮ শতাংশ, পেট্রোল, ওয়েল ও লুব্রিকেন্ট খাতে ৫০ শতাংশ, চুক্তিভিত্তিক যানবাহন ব্যবহারে ৪৭ শতাংশ এবং অফিস ভবন ভাড়া বাবদ ব্যয় ৪৬ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীসহ মোট ১৩টি খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব খাতে বরাদ্দ কমে যাচ্ছে প্রায় ৪৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প সংশোধনের ফলে সামগ্রিক ব্যয় বাড়বে এবং মূল লক্ষ্য পূরণে ব্যয় বৃদ্ধি অপরিহার্য বলে দাবি করছে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন ২০২৫ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে মোট ৬২৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা মোট অনুমোদিত অর্থের প্রায় ৭৩ শতাংশ। এ সময়ে বাস্তব কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৭৮ শতাংশ। প্রকল্পের কাজের এই অগ্রগতির মধ্যেই নতুন বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় এসেছে বিষয়টি। পরিকল্পনা কমিশনের বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) বৈঠকে কর্মকর্তারা এই অতিরিক্ত বরাদ্দ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা জানতে চান। বিশেষ করে কম্পিউটার ও সফটওয়্যার খাতে বিপুল অঙ্কের বরাদ্দ বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। এছাড়া, ৫০ লাখ টাকা চাঁদা, আপ্যায়ন, সম্মানীসহ মনিহারি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় বৈঠকে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথমে “অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন” বা এটুআই প্রকল্প হাতে নেয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল নাগরিক সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা, ই-নথি চালু করা, জাতীয় তথ্য বাতায়ন গড়ে তোলা, মুক্তপাঠ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, মাইগভ সেবা এবং একপে সিস্টেম বাস্তবায়ন করা। পরবর্তীতে ২০২০ সালে এই প্রকল্পকে নতুনভাবে সাজিয়ে “এসপায়ার টু ইনোভেট” নামকরণ করা হয়। বর্তমানে এটুআই প্রকল্পকে “এজেন্সি টু ইনোভেট” হিসেবে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। সরকার বলছে, নতুন এজেন্সি পুরোপুরি কার্যকর হতে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। এই পরিবর্তনের সময়েই প্রকল্পটির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকল্পের শেষ বছরে এ ধরনের বিপুল অঙ্কের নতুন বরাদ্দ যৌক্তিকতার প্রশ্ন তোলে। তাদের মতে, ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে প্রকল্পের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অন্যদিকে, প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও আধুনিকায়নের চাহিদা মেটাতেই বাড়তি ব্যয়ের প্রয়োজন হয়েছে। এই নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভেতরে বিতর্ক তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। তবে প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো এবং বিশেষ করে কম্পিউটার খাতে ৩৪ গুণ বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব গণমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছে। নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে এটুআই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এই ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।